সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ , ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ নরেন্দ্র মোদির শহরে জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক দুর্ভোগ নিরসনের দাবি অপরাধমুক্ত সুনামগঞ্জ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জামালগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ঢুকছে পানি, প্লাবিত হচ্ছে বসতভিটা, আমন ফসল নিয়ে শঙ্কায় কৃষক জামায়াতে ইসলামী থেকে ‘ইসলামী’ শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি যুবদল সভাপতির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালনে প্রস্তুতিমূলক সভা জেলা পুলিশের অনলাইনভিত্তিক কুইজে প্রথম জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পাহাড়ি ঢলে ভেঙেছে আছিয়ার শেষ আশ্রয়, অনিশ্চয়তায় জীবন ছাতক পৌরসভার টেকসই উন্নয়নে আইইউজিআইপি’র সভা জগন্নাথপুর পৌরসভার ২২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা অস্তিত্ব সংকটে পান্ডারখাল বাঁধ ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশুদের বার্ষিক সমাবেশ, ২ হাজার ৭৫০ শিশুর মাঝে উপহার বিতরণ সক্রিয় মাদক কারবারি চক্র মাদক, ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে দিরাই বিএনপিতে বিরোধ চরমে একপক্ষের বহিষ্কারের সুপারিশ, অপরপক্ষের উন্নয়ন সভার ডাক এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব : আইনমন্ত্রী জামায়াতের এমপির ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ভাইরাল, ফেসবুকে যে ব্যাখ্যা দিলেন চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন ২৬ জনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা ৪৮ পদের মধ্যে ৩৬টিই শূন্য জামালগঞ্জে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে শতাধিক বসতভিটা

ভূমধ্যসাগর : যেখানে স্বপ্নরা মরে গিয়ে নোনা জল হয়

  • আপলোড সময় : ৩১-০৩-২০২৬ ০৮:৪২:২২ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ৩১-০৩-২০২৬ ০৮:৪২:২২ পূর্বাহ্ন
ভূমধ্যসাগর : যেখানে স্বপ্নরা মরে গিয়ে নোনা জল হয়
ড. হারুন রশীদ মানুষের এগিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তিই ছিল অভিবাসন। সভ্যতার বিস্তার থেকে শুরু করে আজকের বিশ্ব অর্থনীতি - সবই গড়ে উঠেছে মানুষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলার সাহসে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সময়ে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি দালাল চক্রের হাতে পড়ে একটি বিপজ্জনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৭০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর আগে মানুষ আফ্রিকা থেকে এশিয়া, ইউরোপ এবং পরবর্তীতে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ পথচলা ছিল মূলত খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। অভিবাসনের মাধ্যমেই এক অঞ্চলের জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতি অন্য অঞ্চলে পৌঁছেছে, যা আধুনিক বিশ্ব সভ্যতা গঠনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান বিশ্বেও অভিবাসীরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপিতে বড় অবদান রাখছে। ২০২২ সালের হিসাবে বিশ্বজুড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৮৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে অভিবাসন প্রক্রিয়াটি এক শক্তিশালী মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। দালালরা উন্নত জীবনের রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ পথে যাওয়ার কথা বলে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে লিবিয়া বা মেক্সিকোর মতো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রতি বছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। এছাড়া গহীন জঙ্গল বা মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার সময় চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে গত কয়েক দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। হৃদয়বিদারক তথ্য হলো, তাদের মধ্যে ১২ জনই আমাদের দেশের সুনামগঞ্জের সন্তান। ছয় দিন ধরে সাগরে দিশেহারা হয়ে থাকা এই মানুষগুলোর মৃত্যু হয়েছে কেবল এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি আর সামান্য খাবারের অভাবে। শেষ পর্যন্ত তাদের মরদেহ দাফনটুকুও জোটেনি; সাগরের নোনা জলেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নিথর দেহ। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি চরম মানবিক বিপর্যয় এবং আমাদের সমাজের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ইউরোপে পৌঁছানোর রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে একদল স্বার্থান্বেষী দালালচক্র বছরের পর বছর ধরে তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ - প্রতিটি ধাপে ওত পেতে থাকে মৃত্যু। অথচ এই অনিশ্চিত পথের নেশা আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে কমছে না। সুনামগঞ্জের এই ১২ জন তরুণের মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল যে, দালালেরা পকেটে টাকা ভরার পর আর কোনো দায়িত্ব নেয় না। মাঝ সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হলে বা পথ হারালে তাদের কাছে মানুষের প্রাণের চেয়ে নৌকা বাঁচানোই বড় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবনের আশায় উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপের পথে পা বাড়ায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও)-এর তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগর এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট। সুনামগঞ্জের এই তরুণরা অভাব দূর করতে কিংবা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে দালালের হাত ধরেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝসমুদ্রে নোনা জলে বিলীন হয়ে গেছে। যখন একটি নৌকা সাগরে পথ হারায়, তখন সেখানে মানুষের প্রাণের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রতিকূল পরিবেশ আর দালালের নিষ্ঠুরতা। তৃষ্ণায় কাতর হয়ে এক ফোঁটা পানির জন্য আকুতি করতে করতে মারা যাওয়া কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। খাবার ও পানির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। আরও বড় ট্রাজেডি হলো ধর্মীয় বা সামাজিক মর্যাদায় শেষ বিদায় না পাওয়া। সাগরে লাশ ফেলে দেওয়ার এই নিষ্ঠুরতা সভ্য পৃথিবীর এক কালিমালিপ্ত অধ্যায়। যে পরিবারের সন্তানরা ঘর ছেড়েছিল অভাব দূর করতে, আজ সেই পরিবারগুলো মরদেহটুকু ফিরে পাওয়ার সান্ত¡না থেকেও বঞ্চিত। আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মে মৃতদেহের সসম্মান বিদায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই হতভাগা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সেই অধিকারটুকুও হারালেন। মাঝসমুদ্রে পচন ধরার ভয়ে কিংবা নৌকার ভার কমাতে তাদের লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যে বাবা-মা বা স্ত্রী-সন্তান পথের দিকে চেয়ে বসে ছিলেন প্রিয় মানুষটির ফেরার আশায়, তারা এখন প্রিয়জনের মুখ দেখার সুযোগটুকুও পাবেন না। এই শোক সইবার শক্তি কারো নেই। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক মর্যাদা লাভের আকাক্সক্ষা এবং বিদেশের জৌলুসপূর্ণ জীবনের মিথ্যে প্রচারণা তরুণদের প্রলুব্ধ করছে। অনেকে জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না, এই টাকা দিয়ে তারা আসলে নিজেদের কবরের টিকিট কাটছে। প্রশ্ন জাগে, কেন মানুষ জেনেশুনে এমন মরণফাঁদে পা দেয়? এর পেছনে রয়েছে দেশের ভেতরে টেকসই কর্মসংস্থানের অভাব, উন্নত জীবনের মিথ্যা হাতছানি এবং দালালচক্রের সুনিপুণ প্রলোভন। সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই দালালচক্রগুলো সক্রিয়। তারা তরুণদের বোঝায় যে ইউরোপ গেলেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়া যাবে, কিন্তু তারা কখনোই বলে না যে এই পথের বাঁকে বাঁকে মৃত্যু ওত পেতে আছে। আজ সুনামগঞ্জের গ্রামগুলোতে কেবলই মাতম। জগন্নাথপুরের টিয়ারগাঁও গ্রামে মৃত শায়েক আহমদের বাবা আখলুস মিয়ার আহাজারি বাতাস ভারী করে তুলছে। তিনি তার সন্তানের জন্য বিচার চাইছেন এবং দালাল আজিজুলের ফাঁসি দাবি করছেন। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, অভিযুক্ত দালালদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন মামলা করবে। কিন্তু শুধু মামলার মাধ্যমে কি এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব? এই বিপর্যয় রোধে কেবল শোক প্রকাশ করলেই চলবে না, দরকার কঠোর পদক্ষেপ: ১. দালাল সিন্ডিকেট নির্মূল: প্রতিটি এলাকায় যারা এই মানব পাচারের সাথে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ২. সচেতনতা বৃদ্ধি: বিশেষ করে রেমিট্যান্স-প্রবণ এলাকাগুলোতে স্কুল, কলেজ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচার চালাতে হবে যে, অবৈধ পথ মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। ৩. বৈধ অভিবাসন সহজ করা: দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে সরকারিভাবে নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। ভূমধ্যসাগর আর কত দীর্ঘ হবে লাশের মিছিলে? প্রতিটি মৃত্যু এক একটি পরিবারের মেরুদ- ভেঙে দিচ্ছে। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক কিংবা আর কোনো তরুণের স্বপ্ন সাগরের নোনা জলে তলিয়ে যাক। জীবনের চেয়ে বড় কোনো স্বপ্ন হতে পারে না - এই বোধটুকু আমাদের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। [লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ

উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ